এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশের জনগণের সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের তথ্য সংরক্ষণ কেবল নয়, সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্য নিয়ে সরকার গড়ে তুলছে বিশ্বমানের ডাটা সেন্টার। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে ৭ একর জমির ওপর ক্লাউড কম্পিউটিং ও জি ক্লাউড প্রযুক্তিতে গড়ে উঠছে এই ডেটা সেন্টার। বলা হচ্ছে, এটি বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার, যার ডাউন টাইম শূন্যের কোঠায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আপটাইম ইনস্টিটিউট থেকে টায়ার সার্টিফিকেট অব অপারেশনাল সাসটেইনেবিলিটি সার্টিফিকেশন অর্জনের মাধ্যমে টায়ার-ফোর গোল্ড ফল্ট টলারেন্ট ডাটা সেন্টার হিসেবে ডাটা সেন্টারটি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল) নামে কোম্পানির মাধ্যমে চলছে এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞ। কিন্তু আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন এই প্রতিষ্ঠানে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোক নেই বললেই চলে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের আট জনের মধ্যে মাত্র একজন কারগরি জ্ঞানসম্পন্ন। বাকিরা সবাই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের যুগ্ন সচিব। প্রতিষ্ঠানটির অরগানোগ্রামেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতায় বলা হয়েছে, যেকোনো বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেই তিনি এই পদে আবেদন করতে পারবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্র ও জনগণের সব তথ্যের সুরক্ষার ভার থাকছে যে ডাটা সেন্টারের ওপর, সেই ডাটা সেন্টার পরিচালনায় নিয়োজিত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে এ বিষয়ক কারিগারি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের উপস্থিতি না থাকাটা আশঙ্কাজনক। তাতে রাষ্ট্র ও জনগণের তথ্য অনিরাপদ হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকে যায়। বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অবশ্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি) বলছে, ভবিষ্যতে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে এই কোম্পানিতে। প্রয়োজনে সংশোধন আনা হবে অরগানোগ্রামেও।

বিডিসিসিএলের ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায়, এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যুগ্ন সচিব আবু সাঈদ চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই পদে রয়েছেন। এই পদের জন্য কাউকে এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, একজন চেয়ারম্যানসহ বিডিসিসিএলের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন আট জন।

পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন আইসিটি বিভাগের সিনিয়র সচিব এন এম জিয়াউল আলম। বাকি পরিচালকরা হলেন— বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক পার্থপ্রতিম দেব, অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব আবদুর রহমান খান, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) এ এন এম সফিকুল ইসলাম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব সৈয়দ এমদাদুল হক, প্রতিরক্ষা মন্ত্রলণালয়ের যুগ্ম সচিব রাশেদা জামান ও বুয়েটের ইইই বিভাগের প্রফেসর ড. এস এম মাহবুবুর রহমান। এছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধিও এই পর্ষদে থাকবেন, যার নাম এখনো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিচালনা পর্ষদে বুয়েটের অধ্যাপক ছাড়া তারা কেউই প্রকৌশল বা তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট কারিগরি বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন নন। এরকম একটি বিশাল আইটি প্রকল্পের আট জন বোর্ড সদস্যের মধ্যে কারিগরি বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন সদস্য একজন— এটি আনুপাতিক হারে নগণ্য। বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ডাটা সেন্টারের মতো বড় একটি বিশেষায়িত প্রকল্পে বিষয় সংশ্লিষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের বোর্ড সদস্য হিসেবে না রাখা অগ্রহণযোগ্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত।

মন্তব্য জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর সারাবাংলাকে বলেন, এ ধরনের প্রকল্পে বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন জনবল থাকলে ভালো হয়। কারিগরি জ্ঞান না থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাইরের কারও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এমন স্থানে কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নেওয়াও ঠিক হবে না। বলাই বাহুল্য, এখানে আরও বেশি টেকনিক্যাল পারসন থাকা উচিত।

তিনি বলেন, সরকার তো সবসময় পাবলিক প্রাইভেট অংশীদারিত্বের (পিপিপি) কথা বলে। এখানে বোর্ডে যদি ইন্ড্রাস্টি থেকে কোনো সংগঠনের প্রতিনিধি (বেসিস বা এমন কোনো সংগঠন) নেওয়া হতো, তাহলে বাস্তব বিষয়ের কিছু প্রতিফলন থাকত। এর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন জনবল তো বটেই, একইসঙ্গে এই শিল্পের প্রতিনিধিদেরও বোর্ডে অংশগ্রহণ থাকা উচিত।

ডাটা সেন্টার কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি চান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ হোসেনও। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, এই ডেটা সেন্টারের তথ্যের বড় অংশ এখন সরকার ব্যবহার করছে। ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতও ব্যবহার করবে। তাই এখানে পাবলিক সেক্টর বা ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রতিনিধি থাকা উচিত। আর বোর্ডে যারা আছেন, তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন হলে অবশ্যই ভালো হতো। কিন্তু এমন কারিগরি জ্ঞান থাকতেই হবে, এমন নয়। আমি বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে না নিলেও এই কোম্পানি পরিচালনার জন্য অবশ্যই এই বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন একজন সিইও নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির অনেকটা বেসিস সভাপতির বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করছেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ডাটা সেন্টার এমনিতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তার ওপর এত বড় একটি ডাটা সেন্টার, এটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্তদের বিশেষায়িত জ্ঞান না থাকলে মেইনটেন করা যাবে না। কিন্তু দেশের সবখানেই কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবলের অভাব দেখা যাচ্ছে। আইসিটি খাতের চিত্রও একই। তবে ডাটা সেন্টারে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোক থাকা উচিত। একইসঙ্গে যারা ব্যবসা বোঝেন, এই খাতে ব্যবসা করেন, তাদের প্রতিনিধিও থাকা উচিত।

বিডিসিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের পরিধি বাড়ানোর সময় বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন জনবল অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানালেন কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা আইসিটি সচিব এন এম জিয়াউল আলম। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, পরিচালনা পর্ষদে টেকনিক্যাল লোকের প্রয়োজন নেই। আমরা প্রয়োজন হলে টেকনিক্যাল লোকের পরামর্শ নিয়ে থাকি। আর আমরা মাত্র শুরু করেছি। পরিচালনা পর্ষদের পরিধি বাড়ানো হবে। সেখানে টেকনিক্যাল লোক নিয়োগ দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ডাটা সেন্টার কোম্পানির বোর্ড যখন গঠন করা হয়েছে, তখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে জনবল নিয়ে করা হয়েছে। যিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আছেন, তিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন। আমরা সেই অর্থে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেইনি। এই পদের শিক্ষাগত যোগ্যতায় যেকোনো বিষয়ে স্নাতকোত্তর হিসেবে উল্লেখ থাকলেও সেটিতেও পরিবর্তন আনা হবে। আমরা যোগ্য লোক নিয়োগ দেবো। নিয়োগের সময় আরও অনেক কিছুতে সংশোধন আনা হবে।

এর আগে, ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই ডেটা সেন্টারটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল) নামে কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদন পায়  ২০২০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনো নিজস্ব ব্যবস্থাপনা পরিচালক পায়নি এই কোম্পানি।

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর





Source link

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here